জেনে নিন আধুনিক বিট রুট চাষ পদ্ধতি

আমাদের দেশে মূলত শীতকালে বিট রুট চাষ হয়। এই সবজি ফলের চাষাবাদে খরচ অনেক কম। এক বিঘা জমিতে খরচ হয় ১০-১২ হাজার টাকার মতো।

তবে, বাজারে বিট রুট দাম বেশি হওয়ায় খরচ বাদে ৫০-৬০ হাজার টাকার মতো আয় করা সম্ভব প্রতি বিঘা জমিতে।

বিট রুটের গাছ দেখতে অনেকটা পালং শাকের মতো হলেও রঙে ভিন্নতা আছে। এ সবজির ভেতরের রং গাঢ় লালচে-বেগুনি।

প্রতিটির ওজন হয় গড়ে ২০০ গ্রাম থেকে আধা কেজি পর্যন্ত।

সালাদ, সবজি ও জুসের জন্য অভিজাত শ্রেণির হোটেলে এ সবজির বেশ কদর রয়েছে। পুষ্টিকর খাবার হিসেবেও এটি পরিচিত। দামও ভালো।

তাই আমার আজকের এই নিবন্ধে আধুনিক বিট রুট চাষ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব ।

বিট রুট চাষ পদ্ধতি

বিট রুট বীজ বোনার পর থেকেই শুরু হয় পরিচর্যা। তবে কীটনাশক ও বিষ প্রয়োগ করার প্রয়োজন পরে না।  যার কারণে উৎপাদন খরচও কিছুটা কমে যায়।

বীজ বপনের পদ্ধতি ও সময়

বিট রুট বীজ বপনের উত্তম সময় অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত। এক বিঘা জমির জন্য ৪৭০-৫৩০ গ্রাম প্রয়োজন।

বিট রুটের চাষাবাদের জন্য ঠান্ডা ও আদ্র জলবায়ু উপযুক্ত। উচ্চ তাপমাত্রা ও খরাসহিষ্ণু বিটরুট বাংলাদেশের শীতকালীন আবহাওয়ায় চাষের জন্য খুব উপযোগী।

এছাড়া পর্যাপ্ত সূর্যালোকেরও প্রয়োজন। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাস বিট রুট চাষের উত্তম সময়। তবে আগস্ট মাসের পরই জমি প্রস্তুত করে বীজতলায় বীজ বপন করতে পারলে ভালো।

বীজ বপন

উচ্চফলনশীল বিটরুট বীজ (হাইব্রিড)
উচ্চফলনশীল বিটরুট বীজ (হাইব্রিড)
  • প্রায় ২০ ইঞ্চি দূরে দূরে তৈরীকৃত রিজ/আইলের উপর ২০ সেমি. দূরে দূরে বীজ ২-৩ সেমি. নীচে বপন করতে হবে।
  • কাঙ্খিত গাছের সংখ্যা পাওয়ার জন্য পাশাপাশি দুটি গর্ত করে প্রতিটি গর্তে ১টি করে বীজ বপন করতে হবে।
  • এবং পরবর্তী ২০-২৫ দিন পর প্রতি ২০ সেমি. দূরে একটি করে গাছ রেখে বাকী গাছ তুলে ফেলতে হবে।

জমি ও বীজতলা তৈরি

বিট রুট চাষে জন্য সূর্যালোক পায় এমন জমি প্রথমে ভালোভাবে চাষ দিয়ে প্রস্তুত করে নিতে হবে।

এছাড়া…

  • জমিতে ভালোভাবে ৪-৫টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা ও সমান করে তৈরি করতে হবে।
  • দুই সারিতে চারা রোপণের জন্য জমির চওড়া ও ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার উঁচু বেড তৈরি করতে হবে।
  • দুটি পাশাপাশি বেডের মাঝখানে যাতায়াত ও পানি নিষ্কাশনের জন্য ৩০ সেন্টিমিটার প্রশস্ত এবং ১০-১৫ সেন্টিমিটার গভীর নালা রাখতে হবে।
  • নালার মাটি তুলে বেড উঁচু করতে হবে।

অন্যদিকে বিট রুট চাষের জন্য চারা উৎপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • চারা উৎপাদনের জন্য পানি নিষ্কাশনের সুবিধাসহ উন্মুক্ত জায়গা, বীজতলা তৈরির উপযুক্ত স্থান।
  • তা ছাড়া বীজতলায় সেচ দেয়ার জন্য কাছে পানির উৎস থাকা উত্তম।
  • বীজতলার মাটি অত্যন্ত মিহি করে তৈরি করতে হয়।
  • এঁটেল মাটি হলে কিছু ভিটি বালি মিশিয়ে নিলে ভালো হয়।
  • বীজ বপনের জন্য ৩ মিটারী ১ মিটার বীজতলা হওয়া দরকার।

সার প্রয়োগ ও সেচ পদ্ধতি

বেলে দোআঁশ, দোআঁশ ও এঁটেল মাটিতে বিট রুট ভালো হয়। তবে বিট রুট ভালো ফলনের জন্য মাটিতে যথেষ্ট পরিমাণে জৈবসার থাকা প্রয়োজন।

মাটি উর্বর ও মাটির অম্ল-ক্ষারত্ব (PH) ৬.০-৭.০ হলে ভালো। এছাড়া সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধা আছে এমন জমি বিট রুটের চাষাবাদের জন্য নির্বাচন করতে হবে।

  • জমি চাষ করার পূর্বে সম্পূর্ণ জৈব সার (পচা গোবর) সমানভাবে জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে।
  • রিজ করার পূর্বে সারিতে সম্পূর্ণ টিএসপি, জিপসাম, দস্তা ও বোরণ এবং এক তৃতীয়াংশ ইউরিয়া ও পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে।
  • পরবর্তীতে বীজ বপনের ৩০ ও ৬০ দিন পর বাকি ইউরিয়া ও পটাশ সার সারিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
  • বিট রুট উৎপাদনের জন্য মাটির আদ্রতা অবশ্যই ৬৫% এর উপরে রাখতে হবে।
  • সুগারবিটের সক্রিয় মূল প্রায় ২০০-২৫০ সেমি পর্যন্ত মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে তাই মাটির ৬০ সেমি গভীর থেকে সে প্রায় ৭০% পানি গ্রহণ করে।
  • প্রতি ১০০ কেজি মূল উৎপাদনের জন্য সুগারবিট মাটি থেকে প্রায় ৪০-৪৫ কেজি পানি গ্রহণ করে।
  • সুগারবিটের জীবনকাল মাটির আদ্রতাভেদে ৫-৬ টি সেচ প্রয়োজন হয়।
  • অঙ্কুরোদগম ভালভাবে হওয়ার জন্য বীজ বপনের পরপরই এমনভাবে একটি সেচ দিতে হবে যাতে রিজ/আইল সম্পূর্ণভাবে ভিজে যায়।
  • পরবর্তীতে ১৫/২০ দিন পরপর সেচ দিতে হবে।
  • বিট উত্তোলের ১৫-২০ দিন পূর্বে সেচ প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে।
  • তবে উত্তোলনের সময় মাটি খুব শুকনা ও শক্ত থাকলে সহজভাবে বিট উত্তোলনের জন্য হালকা সেচ প্রয়োগ করা যেতে পারে।
আগাছা দমন ও গোড়ায় মাটি দেওয়া

বিট রুটের ভাল ফলন পাওয়ার জন্য সময়মত আগাছাদমনের প্রয়োজনীয়তা অত্যাধিক।

  • বীজ বপনের পর থেকে ৯০-১০০ দিন পর্যন্ত জমি অবশ্যই আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
  • তিন পর্যায়ে আগাছা দমন করতে হবে; প্রথম ২৫-৩০ দিন পর, দ্বিতীয় ৪৫-৫০ দিন পর এবং তৃতীয় ৭০-৮০ দিন পর।
  • তবে জমিতে আগাছার পরিমাণ বেশি হলে প্রয়োজনে আরও আগাছা দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিট রুট একটি মূলজাতীয় ফসল, তাই গোড়ায় মাটি দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। দ্বিতীয় বার সার উপরি প্রয়োগ করার পর গাছের গোড়ায় মাটি দিতে হবে। মাটি এমনভাবে দিতে হবে যাতে গাছের মাথায় (Crown) মাটি না পড়ে।

 টবে বা ছাদ বাগানে বিট রুট চাষের সহজ পদ্ধতি

শীতকালীন সবজি হিসাবে বিট রুটের কদর বেশি। বাড়িতে সামান্য জায়গায় টবে বা ছাদ বাগানে  খুব সহজেই এই শীতকালীন সবজির চাষ করতে পারেন।

  • সবার আগে মাটি প্রস্তুত করে নিতে হবে।
  • কিছুটা কোকো পিট, কিছুটা বাগানের মাটি, একমুঠো নিম খোল এবং কিছুটা জৈব সার, জৈব সারের মধ্যে নিতে পারেন গোবর সার বা সরষের খোল পচা সার দিয়ে ভালো করে মাটি প্রস্তুত করে নিতে হবে।
  • অন্তত দশ পনেরো দিন এইভাবে একটি ১০ ইঞ্চি টবের মধ্যে মাটিতে জল দিয়ে রাখতে হবে।
  • নার্সারি থেকে চারা কিনে এনে প্রতিটি টবে একটি করে চারা লাগাতে পারেন।
  • বপনের পর চারা প্রথম সাতদিন ছায়াতে রাখতে হবে।
  • নিয়মিত দুবেলা পানি দিতে হবে।
  • কিছুদিন পর গাছ একটু বড় হলে রোদে রাখতে পারেন। এবং নিয়মিত পানি দিতে পারেন।

তবে শুধু টবেই নয়, আপনার বাড়ির সামনের উঠানেও কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে রেখে বিট রুটের বপন করতে পারেন।

ফলন ও ফসল সংগ্রহ

বীজ বপনের ৭০-৮০ দিনের মধ্যে বিট রুট  বিক্রি উপযুক্ত হয়। মাঠ থেকে সাধারণত হাত দিয়ে বিট উত্তোলন করা হয়। সুগারবিটের বিঘা প্রতি ফলন ১০.৬৭-১৩.৩৩ টন হয়।

–লেখাটির বিভিন্ন তথ্য কৃষি তথ্য সার্ভিস ও অনলাইন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।  বগ্লে প্রকাশিত কোনও তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।

আরো পড়ুন … 

**চাষাবাদ ও কৃষি সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, খবর পড়তে আজই জয়েন করুন আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ ” বীজ ঘর ( কৃষি কথা )”  হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ” বীজ ঘর ( কৃষি কথা )” অথবা  টেলিগ্রাম চ্যানেল  ”বীজ ঘর ( কৃষি কথা )’‘ এ। 

মতামত দিন

Item added to cart.
0 items - 0.00