কৃষি কথা

উচ্চমূল্যের সবজি স্কোয়াশ চাষ পদ্ধতি ও পরিচর্যা

স্কোয়াশ চাষ পদ্ধতি

বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চমূল্যের সবজি ফসল স্কোয়াশ চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে কম উর্বর জমি এবং চরাঞ্চল স্কোয়াশ চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত।

স্কোয়াশের চাশাবাদ খুবই লাভজনক। কীভাবে এই বিদেশি সবজির চাষ করা যায়, উৎপাদন খরচ এবং কীভাবে আয় করা সম্ভব সে বিষয়ে আগে জানতে হবে।

তাই আজ আমারা এই নিবন্ধে সঠিক স্কোয়াশ চাষ পদ্ধতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আদ্যোপান্ত আলোচনা করব।

বিদেশি সবজি স্কোয়াশ চাষ পদ্ধতি ও উৎপাদন কৌশল –

জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ বেলে দো-আঁশ বা দো-আঁশ মাটি ও উষ্ণ, প্রচুর সূর্যালোক এবং নিন্ম আর্দ্রতা স্কোয়াশ চাষের জন্য উত্তম।

এই সবজির চাষের অনুকূল তাপমাত্রা হল  ২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চাষাবাদের সময়ে উচ্চতাপমাত্রা ও লম্বা দিন হলে; পুরুষ ফুলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্ত্রী ফুলের সংখ্যা কমে যেতে পারে।

বীজ বপন ও চারা রোপণ পদ্ধতি

শীতকালে স্কোয়াশ চাষের ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি থেকে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) বীজ বোনতে হবে। এছাড়া, আগাম ফসলের জন্য ভাদ্র মাসের প্রথম সপ্তাহ (আগস্ট মাসের মাঝামাঝি) থেকে সরাসরি বীজ বোনা যাবে।

  • স্কোয়াশ চারা নার্সারিতে পলিব্যাগে উৎপাদন করে নিলে ভালো হয়।

    উচ্চফলনশীল স্কোয়াশ বীজ (হাইব্রিড)

    উচ্চফলনশীল স্কোয়াশ বীজ (হাইব্রিড)

  • বীজ বোনার জন্য ৮ থেকে ১০ সেমি. আকারের পলিব্যাগ ব্যবহার করা যাবে।
  • পলিব্যাগে মাটি তৈরি করতে হবে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক গোবর মিশিয়ে।
  • পানিতে ১৫-২০ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে অঙ্কুরোদগম সহজেই হবে।
  • প্রতি ব্যাগে দুটি করে বীজ বোনতে হবে।
  • বীজের আকারের দ্বিগুণ মাটির গভীরে বীজ পুঁতে দিতে হয়।

এছাড়া…… 

  • স্কোয়াশের বীজ সরাসরি মাদায়ও বোনা যাবে।
  • সেক্ষেত্রে সার প্রয়োগ ও মাদা তৈরির ৪-৫ দিন পর প্রতি মাদায় ২-৩টি করে বীজ বোনা উত্তম।
  • চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর ১টি সুস্থ ও সবল চার রেখে বাকিগুলো উঠিয়ে ফেলতে হবে।

স্কোয়াশের চারার বয়স ১৬-১৭ দিন হলে চারা মাঠে লাগানোর জন্য উত্তম। মাঠের মাদাগুলোর মাটি ভালোভাবে ওলটপালট করে চারা বপন করতে হবে এবং চারা লাগানোর পরপর সেচ দিতে হবে।

এক বিঘা জমিতে ছোট সাইজের বীজ হলে ৩০ গ্রাম এবং বড় সাইজের বীজ হলে ৫০০ গ্রামের মতো লাগতে পারে।  বিজ বোনা বা চারা রোপণ করার সময় গাছ থেকে গাছে দূরত্ব ১.৫ ফুট এবং একটি গাছের লাইন থেকে অন্য গাছের লাইনের দূরত্ব হলো ৩ ফুট।

বেড ও মাদা তৈরি

ভালো ফলন পেতে স্কোয়াশ চাষের জমি ভালোভাবে তৈরি করা প্রয়োজন। মাটি ও জমির প্রকারভেদে ৫-৬টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করে নিতে হবে।

এরপর …

  •  বেড তৈরি করতে হবে।
  • বেডের উচ্চতা ১৫-২০ সেমি. ও প্রস্থ ১-১.২৫ মি. এবং লম্বা জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে সুবিধামতো নিতে হবে।
  • পাশাপাশি দুইটি বেডের মাঝখানে ৭০ সেমি. প্রশস্ত সেচ ও নিকাশ নালা থাকবে।
  • প্রতি বেডে এক সারিতে চারা লাগাতে হবে।

এছাড়া…

  • মাদার ব্যাস ৫০-৫৫ সেমি. গভীরতা ৫০-৫৫ সেমি. এবং তলদেশ ৪৫-৫০ সেমি. প্রশস্ত হবে।
  • ৬০ সেমি. প্রশস্ত সেচ ও নিকাশ নালা সংলগ্ন বেডের কিনারা থেকে ৫০ সেমি. বাদ দিয়ে মাদার কেন্দ্র ধরে ২ মিটার অন্তর অন্তর এক সারিতে মাদা তৈরি করতে হবে।

সার প্রয়োগ ও সেচ পদ্ধতি

মাটির অবস্থা বুঝে স্কোয়াশের ভালো ফলনের জন্য মাটির ধরন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে।

এছাড়…

  • গর্তের মাটির সাথে চারা বপনের ১০-১২ দিন আগে জৈব সার মিশিয়ে রাখতে হবে।
  • জৈব সার বলতে গোবর বা কেঁচো জৈব বা ভার্মি জৈব সার হতে পারে।
  • ভালো ফলনের জন্য কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • অবশ্যই মনে রাখতে হবে জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় কোনোভাবেই যেন বেশি জৈব বা গোবর সার না দেয়া হয়।
  • জৈব সার ব্যবহার করলে মাটির গুণাগুণ ও পরিবেশ উভয়ই ভালো থাকবে।
  • তৈরি করা প্রতিটি বেডে বা মাদায় টিএসপি ২ গ্রাম, ইউরিয়া ৮.৫ গ্রাম, এমপি ৬ গ্রাম, জিপসাম ৯ গ্রাম সার দিতে হবে।

জমি প্রস্তুতের সময় গোবর সার, ফসফরাস সার ও পটাশ সারের ৩ ভাগের দুইভাগ জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে। অবশিষ্ট এক ভাগ পটাশ সার বীজ বপনের ৩০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে।

তবে নাইট্রোজেন সার তিনটি সমান ভাগে বীজ বপনের ২৫, ৪০ ও ৬০ দিন পরপর দিতে হবে।

স্কোয়াশ চাষে সার প্রয়োগ

সেচ

স্কোয়াস ফসল পানির প্রতি খুবই সংবেদনশীল; সেচ নালা দিয়ে প্রয়োজন অনুসারে নিয়মিত সেচ দিতে হবে। তবে প্রতিবার সার দেয়ার পর হালকা সেচ দিয়ে মাটি ভিজিয়ে দিতে হবে।

  • স্কোয়াশ চাষের জমিতে পানি বেশি সময় জমতে দেয়া যাবে না।
  • শুধু সেচ নালায় পানি দিয়ে আটকে রাখলে গাছ পানি টেনে নেবে।
  • প্রয়োজনে সেচনালা হতে ছোট কোনো পাত্র দিয়ে কিছু পানি গাছের গোড়ায় দেয়া যাবো।
  • শুষ্ক মৌসুমে এক মাস পর পর জমিতে সেচ দিতে হবে।
পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন

স্কোয়াশ ক্ষেত সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাদা মাছি ও জাব পোকার আক্রমনে। এছাড়া পরিচিত রোগ হলো হুলু মোজাইক ভাইরাস এবং পাতা কুঁকড়ে যাওয়া।

সাধারণত এই দুটি রোগ হয় সাদা মাছি বা জাব পোকার কারণে। অন্যদিকে ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে স্কোয়াশ ফসল বাঁকা হয়ে যায়।

এর ফলের মান ঠিকমত না হওয়ায় ফসলে মূল্য কমে যায়।

সাদা মাছি : 

  • প্রথমে এই পোকা কচিফল ও ফুলের মধ্যে ডিম পাড়ে।
  • পরে ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফল-ফুলের ভেতর কুড়ে কুড়ে খায়।
  • ফলে ফল ও ফুল পচন ধরে নষ্ট হয়ে যায়।
  • এ পোকার আক্রমণের ফলে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ ভাগ ফল নষ্ট হয়ে যায়।
  • এই পোকা দমনে আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে।
  • পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করতে হবে।
  • সেক্স ফেরোমন ফাঁদের ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • এছাড়া  মাছির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার জন্য বিষটোপ অত্যন্ত কার্যকর।

রেড পামকিন বিটল: 

পামকিন বিটলের পূর্ণ বয়স্ক পোকা চারা গাছের পাতায় ফুটো করে এবং পাতার কিনারা থেকে খাওয়া শুরু করে সম্পূর্ণ পাতা খেয়ে ফেলে।

  • এ পোকা ফুল ও কচি ফলেও আক্রমণ করে।
  • জাবপোকার আক্রমণে বাড়ন্ত ডগা ও পাতা হলুদ হয়ে যায়।
  • গাছ তার সতেজতা হারিয়ে ফেলে এবং ফলন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্তবয়স্ক জাবপোকা দলবদ্ধভাবে গাছের পাতার রস চুষে খায়।
  • ফলে পাতা বিকৃত হয়ে যায়, বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও প্রায়শ নিচের দিকে কোঁকড়ানো দেখা যায়।
  • মেঘলা, কুয়াশাচ্ছন্ন এবং ঠান্ডা আবহাওয়ায় জাবপোকার বংশ বৃদ্ধি বেশি হয়।
  • প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হলে এদের সংখ্যা কমে যায়।
  • এই পোকা দমনে হাত দিয়ে পূর্ণ বয়স্ক পোকা ধরে মেরে ফেলতে হবে
  • এবং সব সময় ক্ষেত পরিষ্কার রাখতে হবে।
  • এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কমে যাবে নিমবীজের দ্রবণ বা সাবান গোলা পানি স্প্রে করলে।
  • এছাড়া বন্ধু পোকাসমূহ সংরক্ষণ করলে এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কম যায়।

যেসব সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে: চারা বের হওয়া থেকে পাঁচ দিন পর পর সাদা মাছি বা জাব পোকা দমনে নাম করা ওষুধ  কোম্পানির ব্যবহার করতে পারেন। তবে,  ভাইরাস আক্রান্ত গাছে ওষুধ না ছটিয়ে সরাসরি গাছ তুলে ফেলে মাটি চাপা দিতে হবে।

বিশেষ পরিচর্যা ও ফসল সংগ্রহ

সাধারণত ১৬-২৫ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা ও শুষ্ক পরিবেশ স্কোয়াশ উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। রাতের তাপমাত্রা ১৭-২১ ডিগ্রি সে. এর কম বা বেশি হলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফুল ঝরে পড়ে ও ফলন কম হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একবারেই ফলন হয় না।

পরিচর্যা …
  • স্কোয়াশ ক্ষেতের মাটির ঢেলা ভেঙে দিতে হবে। গাছের বাউনি ও অন্যান্য যত্ন করতে হবে।
  • জমিতে আগাছা জন্মাতে দেওয়া যাবে না।
  • আগাছা জন্মালে তা নিড়ানির সাহায্যে তুলে ফেলতে হবে।
  • কৃত্রিম পদ্ধতিতে পুরুষ ফুলের রেণু স্ত্রী ফুলের ওপর ছড়িয়ে দিলে উৎপাদন বাড়বে।
  • গাছের গোড়ার দিকে ছোট ছোট শাখা-প্রশাখা বের হয়।
  • এগুলোকে শোষক শাখা বলে।
  • শোষক শাখা গাছ বৃদ্ধিতে বাধা দেয় ও ফলন কমিয়ে দেয়। এগুলোকে ভেঙে দিতে হবে।

স্কোয়াশে পরাগায়নের ১০-১৫ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করতে হবে। তখনও ফলে সবুজ রঙ থাকবে এবং ফল মসৃণ ও উজ্জ্বল দেখাবে। নখ দিয়ে ফলের গায়ে চাপ দিলে নখ সহজেই ভেতরে ঢুকে যাবে।

–লেখাটির বিভিন্ন তথ্য কৃষি তথ্য সার্ভিস ও অনলাইন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।  বগ্লে প্রকাশিত কোনও তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।

আরো পড়ুন … 

**চাষাবাদ ও কৃষি সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, খবর পড়তে আজই জয়েন করুন আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ ” বীজ ঘর ( কৃষি কথা )”  হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ” বীজ ঘর ( কৃষি কথা )” অথবা  টেলিগ্রাম চ্যানেল  ”বীজ ঘর ( কৃষি কথা )’‘ এ। 

One thought on “উচ্চমূল্যের সবজি স্কোয়াশ চাষ পদ্ধতি ও পরিচর্যা

  1. Md. Al-Amin says:

    বীজ পাবো কিভাবে……

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *