ভিন দেশি টিউলিপ ফুল চাষ, সঠিক পদ্ধতি জেনে নিন

ভিন দেশি টিউলিপ ফুল চাষ এবার বাংলাদেশে শুরু হয়েছে। এদেশের আবহাওয়া টিউলিপ ফুল চাষের জন্য যথার্থ না হলেও ফুলপ্রেমীরা চাষিরা বাণিজ্যিকভাবে এ ফুলের চাষ করে সফলতা দেখাচ্ছে।

পুষ্পজাতীয় উদ্ভিদ ‘টিউলিপ’ সাধারণত পাহাড়ি ও শীত প্রধান অঞ্চলের ফুল, ১০-১৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা লাগে এই এই ফুল চাষাবাদের জন্য।

আমাদের দেশে টিউলিপের চাহিদা থাকায় এতোদিন এই ফুল আমদানি করে চাহিদা মেটানো হতো। ইদানিং এদেশে টিউলিপ চাষ সফল হওয়ায় এখন আশা যোগাচ্ছে ফুল চাষিদের।

আজ আমরা এই নিবন্ধে কিভাবে এদেশে সফলতার সাথে টিউলিপ ফুল চাষ করবেন তার বিস্তারিত তুলে ধরব।

বাংলাদেশে যেভাবে টিউলিপ ফুল চাষ করবেন

টিউলিপ ফুলের অনেক জাত থাকলেও মূলত শ্রেণী রয়েছে ৩টি (প্রারম্ভিক ফুল আসা, মাঝামাঝি ফুল আসা, দেরিতে ফুল আসা)।

বাংলাদেশের আবহাওয়া টিউলিপ ফুল চাষের খুব একটা উপযুক্ত নয়। কেননা এই  ফুলগাছ যতটা নিম্নি তাপমাত্রায় হয়, এদেশের তাপমাত্রা ততটা নিচে নামে না।

  • তাই টিউলিপ চাষের জন্য টিউলিপ বাল্বকে রোপনের আগে অবশ্যই কোল্ড শক দিতে হবে।
  • এরপর টিউলিপ বাল্বকে বছরের সবচেয়ে শীতল সময়ে লাগাতে হবে।
  • তবে শীতপ্রধান দেশে কোল্ড শক দেওয়ার জন্য ফ্রিজে রাখার প্রয়োজন হয় না।
  • আমাদের দেশে বাল্বগুলোকে ফ্রিজে রেখে ঠাণ্ডা পরিবেশ দিতে হবে।
  • টিউলিপ ফুল সম্পূর্ণ রোদে বা আংশিক ছায়ায় জন্মানো যায়।
  • তবে এই ফুলের বৃদ্ধি ও গুণাগত মান অব্যহত রাখার জন্য দিনের তাপমাত্রা ২০-২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও রাতে ৫-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রয়োজন।
  • এছাড়া সকালে সরাসরি সূর্যের আলো উপযোগী হলেও মধ্যাহ্নের সময় (১২- ৪টা) আংশিক ছায়া প্রয়োজন।
  • ফুলের উন্নত মান এবং ফলনের জন্য উদ্ভিদ বৃদ্ধির পুরোটা সময় জুড়ে মাটির পর্যাপ্ত আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে।
  • টিউলিপ তুষারপাতের ক্ষেত্রে যেমন খুব সংবেদনশীল তেমনি গরম জলবায়ুতে টিউলিপের বৃদ্ধি একটু কঠিন।
  • সেক্ষেত্রে টিউলিপ ফুল চাষের জন্য গ্রিনহাউজ এবং পলিহাউজের মতো সুরক্ষিত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ সবচেয়ে উত্তম।

টিউলিপ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় মাটির বৈশিষ্ট্য

টিউলিপ মূলত পার্বত্য এলাকায় চাষাবাদের উপযোগী ফুল। ভাল বৃদ্ধি এবং ফলনের জন্য উঁচু বেলে-দোআঁশ মাটি টিউলিপ ফুল চাষের জন্য উৎকৃষ্ট।

  • সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে সেচের পানির সুনিষ্কাশিত জমিতে টিউলিপ বাল্বের জন্য সবচেয়ে উপযোগি।
  • ভারী মাটির ক্ষেত্রে, ভাল পচনশীল কম্পোস্ট বা পিট মস বা অন্যান্য জৈব পদার্থ যোগ করলে ফসল বৃদ্ধিতে অনেক সহয়াক।
  • বাণিজ্যিক চাষাবাদে টিউলিপ চাষের জমির উর্বরতা নিশ্চিত করতে মাটি পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

জমি তৈরি ও রোপণ পদ্ধতি

টিউলিপ চাষাবাদের জমির মাটিকে সূক্ষ্মভাবে চাষ দিয়ে মাটি ঝরঝরে করে নিয়ে এবং আগাছা পরিষ্কার করে জমি তৈরি করতে হবে।

  • বাল্বলেট ও বাল্ব দ্বারা টিউলিপ ফুল বংশবিস্তার করে।
  • টিউলিপ বাল্ব রোপণ করতে হবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে (কারণ সেপ্টেম্বরের আগে শীতনিদ্রার জন্য প্রস্তুত থাকে না ফুলগাছটি)।
  • বাল্বগুলো রোপণের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ফ্রিজেই রাখতে হবে; এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
  • যে স্থানে লাগানো হবে সেটি অবশ্যই শীতলীকরণ করতে হবে।
  • সূর্যের নিচে কিছুতেই রাখা যাবে না।
  • টিউলিব বাল্ব ৬-১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রার মাটিতে রোপন করা উচিত; এতে শিকড় গজাতে সুবিধা হয়।
  • কম্পোস্ট সার মিশিয়ে লাগালে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
  • কেউ যদি টবে লাগাতে চান তাহলে বড় টব ও মাটির বেশ গভীরে রোপন করতে হবে বাল্বগুলো।
  • বাল্বগুলো যাতে বেশি গরম না হয় সেজন্য মাটির খুব গভীরে লাগানো হয়।
  • মাটিতে রোপনের পর ছাউনি করে দিতে হবে, যাতে বাল্ব সূর্যের তাপ না লাগে।
  •  এছাড়া নিয়মিত সেচ দিয়ে মাটির তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে হবে।
  • আবার গাছের গোড়ায় পানি জমলে বাল্ব নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন তৈরি করতে হবে।
  • মোটকথা গোড়ার মাটি হাল্কা ভেজা থাকলেই হবে।
  • বিদেশ থেকে টিউলিপ সংগ্রহ করা হলে বাল্বগুলো শীতের মাঝামাঝিতে সরাসরি মাটিতে লাগালে চলবে।
  • কেননা বিদেশের বাজারে যে বাল্বগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোতে কোল্ড শক দেওয়া থাকে।

পাহাড়ি আবহাওয়া ও শীতকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত টিউলিপ চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। ফুল ফুটলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাল্বকে উঠিয়ে ফেলতে হবে এবং নতুন করে বাল্ব লাগাতে হবে।

 সেচ ও পরিচর্যা

টিউলিপ চাষে সেচ ব্যবস্থাপনা মাটির ধরন, জলবায়ু ইত্যাদির উপর নির্ভর করে।

  • তবে সেচের পানির নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হবে, না হলে গাছে পচন রোগ ও বিভন্ন  পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা থাকে।
  • টিউলিপ ক্ষেত আগাছামুক্ত রাখতে হবে সব সমময়।
  • আর্দ্রতা হ্রাস থেকে রক্ষা করতে এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণ করতে টিউলিপ গাছগুলিকে মালিচং করতে পারেন।
  • গোবর সার এবং কম্পোস্ট সার টিউলিপ চাষের জন্য চমৎকার জৈবসার, এছাড়া পচা ফার্মইয়ার্ড সার ৩-৫ কেজি প্রতি বর্গমিটার প্রয়োগ করতে পারেন।
  • টিউলিপ চাষের ক্ষেত্রে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসমৃদ্ধ দ্রবণ মাল্টিপ্লেক্স ১-২বার ৫০ পিপিএম পরিমাণ স্প্রে করতে পারেন; এতে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
  • অজৈব সার হিসেবে ঘচক ৫-১০-৫ হিসাবে, ৫% নাইট্রোজেন , ১০% ফসফরাস বং ৫% পটাশিয়াম সহ জমিতে ব্যবহার করা উচিত।
রোগবালাই দমন

টিউলিপ ফুলে থ্রিপসের আক্রমণ হয় খুব বেশি, এছাড়া বাল্ব পচা রোগ নিয়ন্ত্রনে ব্যাভিস্টিন (০.১%) বা ডাইথেন এম-৪৫ (০.২%)  ব্যবহার করতে পারেন।

টিউলিপ ফসল এফিড দ্বারা আক্রান্ত হলে এন্ডোসালফান, ম্যালাথিয়ন, অ্যালডিকার্বসের সুপারিশকৃত ডোজ পোকা নিয়ন্ত্রণে উপকারী।

ফলন ও ফুল সংগ্রহ

জাত ও আকারভেদে  টিউলিপ ফুলের ফলন ভিন্ন হতে পারে।  সাধারণত মধ্য-পাহাড় অঞ্চলে ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল এবং উঁচু-পাহাড় অঞ্চলে এপ্রিল জুনে টিউলিপ ফুল ফোটা শুরু করে।

ফুলের পাপড়িতে ২৫-৫০ ভাগ রঙ বিকশিত হলে দুটি পাতাসহ স্ক্যাপগুলো কেটে ফেলতে হবে।

 

বগ্লে প্রকাশিত কোনও তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।

আরো পড়ুন … 

**চাষাবাদ ও কৃষি সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, খবর পড়তে আজই জয়েন করুন আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ ” বীজ ঘর ( কৃষি কথা )”  হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ” বীজ ঘর ( কৃষি কথা )” অথবা  টেলিগ্রাম চ্যানেল  ”বীজ ঘর ( কৃষি কথা )’‘ এ। 

মতামত দিন

Item added to cart.
0 items - 0.00
Need Help?