এক নজরে — তরমুজ চাষ কেন এখন সবচেয়ে লাভজনক?
বাংলাদেশে তরমুজ চাষ ২০১৮-১৯ সালের ৩৪,৬১৫ হেক্টর থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় তিনগুণ হয়ে ৯১,৭১৫ হেক্টরে উন্নীত হয়েছে।[³] খুলনা অঞ্চলের কৃষক আব্দুল হামিদ জানান, “আগে দুই বিঘায় ধান চাষে ২০ হাজার টাকা পেতাম, এখন একই জমিতে তরমুজে ২ লাখ টাকা আয় হচ্ছে।”[⁴]
এই গাইডে জানবেন — বীজ বপন থেকে ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের সবকিছু।
তরমুজ চাষ সম্পর্কে দ্রুত তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| বৈজ্ঞানিক নাম | Citrullus lanatus |
| বীজ বপনের সময় | জানুয়ারির শেষ – ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৫ দিন (সর্বোত্তম) |
| চাষের মৌসুম | ফেব্রুয়ারি – এপ্রিল; নভেম্বর–ডিসেম্বর (আগাম) |
| বীজের পরিমাণ | ১.৫-২ গ্রাম প্রতি শতক |
| ফসল সংগ্রহ | বীজ বোনার ৮০-১১০ দিন পর |
| গড় ফলন | ৫০-৬০ টন/হেক্টর |
| উপযুক্ত মাটি | উর্বর দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ |
| চাষের তাপমাত্রা | ২৫°C; পাকার সময় ২৮-৩০°C |
| বিঘাপ্রতি খরচ | ২০,০০০ – ২৫,০০০ টাকা |
| বিঘাপ্রতি আয় | ১,০০,০০০+ টাকা |
দ্রুত উত্তর: তরমুজ বীজ বপনের সর্বোত্তম সময় জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৫ দিন। DAE-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে তরমুজের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫১.৯ টন।[⁴]
জনপ্রিয় উন্নত জাতসমূহ
দেশি কোম্পানির জাত:
- সুপ্রিম সীড: জাম্বু, গ্লোরি, ড্রাগন কিং
- এ আর মালিক: ফিল্ডমাস্টার, ওয়ার্ল্ড কুইন, বিগ টপ, পাকিজা, সুইট ক্রাঞ্চ
- ইস্পাহানি: সুইট গ্রিন, সুইট ড্রাগন, গ্রিন ডায়মন্ড, সুগার কিং, কালো মানিক
- লাল তীর: ডক্টর সুপার, ব্ল্যাক জায়ান্ট
- সিনজেন্টা: ড্রাগন, সুপার ড্রাগন
- বীজ ঘর: হাইব্রিড বীজ ঘর ১ স্পেশাল তরমুজ বীজ (বারোমাসি)
বিশেষ জনপ্রিয় জাত:
- সুগার বেবি — বারো মাসই উৎপাদন সম্ভব, দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয়
- ইয়েলো বেরি — উপরে হলুদ, ভেতরে লাল; প্রতিটি প্রায় ৫ কেজি
- সাম্মাম — উপরে গাঢ় হলুদ, ভেতরে লাল; প্রতিটি প্রায় ৫ কেজি
BAU-এর গবেষণায় (Awal & Dhar, 2021) Dragon ও Badsha জাতে সর্বোচ্চ ফলন ও BCR পাওয়া গেছে এবং কালো খোসার জাতগুলোতে মিষ্টতার সূচক সর্বোচ্চ।[¹]
জলবায়ু ও মাটি
তরমুজ পাকার সময় সূর্যের আলোর অভাব হলে মিষ্টতা ও ঘ্রাণ নষ্ট হয়ে যায়। FAO-র নির্দেশিকা অনুযায়ী তরমুজ চাষে pH ৫.৮ থেকে ৭.২ মাটি আদর্শ এবং ফল পাকার সময় অতিরিক্ত পানি সরবরাহ চিনির পরিমাণ কমিয়ে দেয়।[²]
উপযুক্ত তাপমাত্রা: চাষের সময় ২৫°C; ফল পাকার সময় ২৮-৩০°C। ১৫°C-এর নিচে বীজ অঙ্কুরিত হয় না।
উপযুক্ত মাটি: উর্বর দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি। পানি নিষ্কাশনের সুবিধা অবশ্যই থাকতে হবে।
ধাপে ধাপে তরমুজ চাষ পদ্ধতি
ধাপ ১ — বীজ বপনের সময় ও পরিমাণ
সর্বোত্তম সময়: জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৫ দিন
চাষের মৌসুম:
- প্রধান মৌসুম: ফেব্রুয়ারি – এপ্রিল
- আগাম মৌসুম: নভেম্বর – ডিসেম্বর (পলি টানেল ব্যবহার করুন)
বীজের পরিমাণ: প্রতি শতকে ১.৫-২ গ্রাম। প্রতি মাদায় ৪-৫টি বীজ বপন করুন। চারা গজানোর পর প্রতি মাদায় ২টি চারা রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলুন।
ধাপ ২ — বীজ থেকে চারা তৈরি
অঙ্কুরোদগমের জন্য কমপক্ষে ২৫-৩০°C তাপমাত্রা প্রয়োজন।
চারা তৈরির পদ্ধতি: ১. বীজ ৪০-৫০ মিনিট রোদে শুকিয়ে সুপ্ততা ভাঙুন ২. বীজ ১০-১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন ৩. প্রোভ্যাক্স ৩গ্রা/লিটার বা কার্বেন্ডাজিম মিশ্রিত পানিতে ৩০ মিনিট শোধন করুন ৪. ছোট পলিব্যাগে বালি ও পচা গোবর সার ভরে প্রতি ব্যাগে একটি করে বীজ বপন করুন
তীব্র শীতে বিকল্প: বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালিয়ে পলিথিন ব্যাগে বীজ ঝুলিয়ে রাখুন বা ভেজা কাপড়ে বেঁধে খড়ের গাদায় রাখুন — ২-৩ দিনেই অঙ্কুরিত হবে।
ধাপ ৩ — জমি তৈরি ও মাদা প্রস্তুত
প্রতিটি মাদা ৫০ সেমি প্রশস্ত ও গভীর হওয়া প্রয়োজন।
মালচিং পদ্ধতি (সর্বোত্তম): মালচিং করে মাচা তৈরি করলে বৃষ্টি ও মাটির পোকা থেকে ফল রক্ষা পায়।
- জমির আইল থেকে ২ ফুট ফাঁকা রেখে শুরু করুন
- ৩ ফুট বেডের পাশে ৭ ফুট ফাঁকা রাখুন (মাচার জায়গা)
ধাপ ৪ — সার প্রয়োগ পদ্ধতি
বেড তৈরির সময় (প্রতি শতকে):
| সারের নাম | পরিমাণ |
|---|---|
| গোবর/কম্পোস্ট | ৮০-৯০ কেজি |
| টিএসপি | ৪০০-৪৫০ গ্রাম |
| ডিএপি | ৮০০-৯০০ গ্রাম |
| এমওপি | ৪০০-৪৫০ গ্রাম |
| জিপসাম | ৪০০-৪৫০ গ্রাম |
| দস্তা | ৩০-৪০ গ্রাম |
| বোরন | ৪৫-৫০ গ্রাম |
FAO-র নির্দেশিকা অনুযায়ী উচ্চ ফলনের জন্য হেক্টরপ্রতি ৮০-১০০ কেজি নাইট্রোজেন, ২৫-৬০ কেজি ফসফরাস এবং ৩৫-৮০ কেজি পটাশিয়াম সার প্রয়োজন।[²]
উপরি সার (প্রতি শতকে):
| কিস্তি | সময় | ইউরিয়া | এমপি |
|---|---|---|---|
| ১ম | চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর | ৪০০-৪২০ গ্রাম | ৩২০-৩৩০ গ্রাম |
| ২য় | প্রথম ফুল ফোটার সময় | ২৪০-২৫০ গ্রাম | ৩২০-৩৩০ গ্রাম |
| ৩য় | ফল ধারণের সময় | ২৪০-২৫০ গ্রাম | ৩২০-৩৩০ গ্রাম |
| ৪র্থ | ফল ধারণের ১৫-২০ দিন পর | ২৪০-২৫০ গ্রাম | ৩২০-৩৩০ গ্রাম |
ধাপ ৫ — চারা রোপণ ও মাচা তৈরি
তরমুজের বীজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল — তাই চারা রোপণ করা উত্তম। একমাস বয়সের ৪-৫ পাতাবিশিষ্ট চারা মাদায় রোপণ করুন।
দুই বেডের মাঝে আড়াই হাতের ৪টি খুঁটি পুঁতে বাঁশের বাতা ও নেট দিয়ে মাচা তৈরি করুন।
ধাপ ৬ — শাখা ছাঁটাই ও পরাগায়ন
শাখা ছাঁটাইয়ের নিয়ম:
- প্রথমবার: ২টি শাখা রেখে বাকিগুলো ছেঁটে দিন
- দ্বিতীয়বার: ৫-৭ দিন পর আবার ছাঁটাই
- তৃতীয়বার: দ্বিতীয়বারের ৮-৯ দিন পর আবার ছাঁটাই
- প্রতি গাছে ৩-৪টির বেশি ফল রাখবেন না
পরাগায়ন: সকালবেলা স্ত্রী ফুলে পুরুষ ফুলের পরাগ হাত দিয়ে লাগিয়ে দিলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
ধাপ ৭ — পরিচর্যা ও ফসল সংগ্রহ
- শুকনো মৌসুমে নিয়মিত সেচ দিন — গোড়ায় পানি জমতে দেবেন না
- তরমুজ বড় হলে মাটির উপর খড় বিছিয়ে দিন (গোড়াপচা রোগ প্রতিরোধে)
- ফল পাকার সময় পানি কমালে মিষ্টতা বাড়ে[²]
তরমুজ পেকেছে কিনা বোঝার উপায়:
- বোঁটা শুকিয়ে বাদামি রং
- খোসা চকচকে
- টোকা দিলে ড্যাব ড্যাব শব্দ
প্রত্যাশিত ফলন: প্রতি হেক্টরে ৫০-৬০ টন।
পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন
| রোগ/পোকা | লক্ষণ | প্রতিকার |
|---|---|---|
| জাব পোকা | কচি ডগার রস শুষে নেয় | ইমিডাক্লোপ্রিড ০.৫মিলি/লিটার; ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে |
| কাণ্ড পচা রোগ | গোড়ার কাণ্ড পচে যায় | ম্যানকোজেব ২গ্রা/লিটার; ১০-১২ দিন পর পর স্প্রে |
| কাটুই পোকা | রাতে চারা কেটে দেয় | মাটি খুঁড়ে পোকা মারুন; কেরোসিন-মিশ্রিত পানি সেচ |
| ডাউনি মিলডিউ | পাতায় সাদা/হলদে দাগ | আক্রান্ত অংশ ধ্বংস; ছত্রাকনাশক স্প্রে |
| গামি স্টেম ব্লাইট | কাণ্ড ফেটে লালচে আঠা | আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলুন; বিশেষজ্ঞের পরামর্শে স্প্রে |
| ভাইরাস | পাতা হলুদ-সবুজ ছোপ; ফল ধরে না | আক্রান্ত গাছ পুঁতে ফেলুন; সাদামাছি দমন করুন |
| রেড পামকিন বিটল | পাতা ফুটো করে | হাত দিয়ে পোকা মারুন; ২৫ দিন মশারির জাল দিয়ে ঢেকে রাখুন |
| সুড়ঙ্গকারী পোকা | পাতায় আঁকাবাঁকা দাগ | আক্রান্ত পাতা পুড়িয়ে ফেলুন; হলুদ ফাঁদ স্থাপন |
সাবধানতা: কীটনাশক স্প্রের ১৫ দিনের মধ্যে ফল খাওয়া বা বিক্রি করা যাবে না।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
উত্তর: জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৫ দিন বীজ বপনের সর্বোত্তম সময়। মূল চাষের মৌসুম ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল।
উত্তর: জাত ও আবহাওয়া ভেদে বীজ বোনার ৮০-১১০ দিনের মধ্যে তরমুজ পাকে।
উত্তর: DAE-এর তথ্য অনুযায়ী বিঘাপ্রতি খরচ ২০,০০০-২৫,০০০ টাকা এবং আয় প্রায়ই ১ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।[⁴]
উত্তর: বোঁটা বাদামি ও শুকনো হলে, খোসা চকচকে দেখালে এবং টোকা দিলে ড্যাব ড্যাব শব্দ হলে তরমুজ পেকেছে।
উত্তর: হ্যাঁ, আগাম কিছু জাত নভেম্বর-ডিসেম্বরে বপন করা যায়। তবে পলি টানেল ব্যবহার করতে হবে, কারণ ১৫°C-এর নিচে বীজ অঙ্কুরিত হয় না।
উত্তর: সকালে হাত দিয়ে স্ত্রী ফুলে পুরুষ ফুলের পরাগ লাগিয়ে দিলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
উত্তর: সুগার বেবি জাত বারো মাসই উৎপাদন করা যায় এবং এটি দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয়।
সংক্ষিপ্ত চাষ ক্যালেন্ডার
| সময় | কাজ |
|---|---|
| জানুয়ারির শেষ – ফেব্রুয়ারির প্রথম | বীজ শোধন ও বপন |
| বীজ বপনের পর | পলিব্যাগে চারা তৈরি |
| চারার বয়স ১ মাস | মাদায় চারা রোপণ |
| রোপণের ১০-১৫ দিন পর | ১ম কিস্তি উপরি সার |
| রোপণের ১৫ দিন পর | ফেরোমন ও হলুদ ফাঁদ স্থাপন |
| প্রথম ফুল ফোটার সময় | ২য় কিস্তি সার + কৃত্রিম পরাগায়ন |
| ফল ধারণের সময় | ৩য় কিস্তি সার |
| ফল ধারণের ১৫-২০ দিন পর | ৪র্থ কিস্তি সার |
| বীজ বপনের ৮০-১১০ দিন পর | ফসল সংগ্রহ |
তথ্যসূত্র ও সাইটেশন
[¹] Awal, M.A. & Dhar, P.C. (2021). Phenological and morpho-physiological development of watermelon varieties. Bangladesh Agricultural University. DISCOVERY 57(312). https://www.researchgate.net/publication/339352503 (BAU গবেষণা — Dragon ও Badsha জাতের সর্বোচ্চ ফলন ও BCR)
[²] FAO Land & Water. Watermelon — Crop Water Requirements and Production Guidelines. https://www.fao.org/land-water/databases-and-software/crop-information/watermelon/en/ (তরমুজের মাটি, pH, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা)
[³] Department of Agricultural Extension (DAE). Cited in: FreshPlaza Asia, March 2025. https://www.freshplaza.com/asia/article/9712985/ (DAE তথ্য — ৯১,৭১৫ হেক্টরে চাষ, ৩.৬ মিলিয়ন টন উৎপাদন)
[⁴] BSS News (September 26, 2025). Watermelon farming transforms rural economy in Khulna. https://www.bssnews.net/others/315609 (DAE Khulna — হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৫১.৯ টন; কৃষকের আয়-ব্যয় বিশ্লেষণ)
[⁵] BRAC Agriculture R&D Centre. Research Activities on Watermelon in Bangladesh. ResearchGate, 2020. https://www.researchgate.net/publication/292157652 (বাংলাদেশে তরমুজ চাষের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ)
এই তথ্য বীজঘর কৃষি কথা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত।
আরো পড়ুন …
- কোন মাসে কী ধরনের শাক-সবজি ও ফল চাষ করবেন
- জেনে নিন ঢেঁড়শ চাষ পদ্ধতি, পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে করণীয়
- একসাথে বেগুন ও শসার চাষের পদ্ধতি
- তীব্র শীতে সবজি চাষ, করণীয় ও স্প্রে সিডিউল
Discover more from BeejGhor.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
