এক নজরে — শিম চাষ কেন লাভজনক?
শিম (Lablab purpureus / Dolichos lablab) বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় শীতকালীন সবজিগুলোর একটি। BAMiS-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পঞ্চাশটিরও বেশি স্থানীয় শিমের জাত রয়েছে এবং আধুনিক উচ্চফলনশীল জাত ব্যবহারে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।[¹] ResearchGate-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় (Islam et al., 2019) দেখা গেছে, শিম একটি নাইট্রোজেন সংযোজনকারী ফসল — তাই সার খরচ কম এবং শীতকালীন শিম চাষে বালাইনাশকও কম লাগে।[²]
শিম চাষের বিশেষ সুবিধা:
- বীজ বপনের ৫৫-৬০ দিনে ফুল আসে; ফুলের ২০-২৫ দিন পর ফসল সংগ্রহ
- ৪ মাসেরও বেশি সময় ধরে ফলন পাওয়া যায়
- জমি ছাড়াও রাস্তার ধারে, আইলে, ছাদে চাষ সম্ভব
এছাড়া সঠিক সময়ে বিজ্ঞান সম্মত আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করলে শিম চাষে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। কারণ শিম গাছে অন্য সবজির মতো ভাইরাসের আক্রমণ নাই বললেই চলে; সার প্রয়োগেরও তেমন প্রয়োজন পড়ে না।
শিম চাষ সম্পর্কে দ্রুত তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| বৈজ্ঞানিক নাম | Lablab purpureus / Dolichos lablab |
| আগাম চাষে বীজ বপন | জ্যৈষ্ঠ – আষাঢ় মাস |
| শীতকালীন বীজ বপন | ভাদ্র থেকে আশ্বিন (আগস্ট–সেপ্টেম্বর) |
| উপযুক্ত মাটি | দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ |
| মাদার আকার | ৪৫×৪৫×৪৫ সেমি |
| মাদা থেকে মাদার দূরত্ব | ৩.০ মিটার |
| প্রতি মাদায় বীজ | ৪-৫টি |
| বীজের হার | ৪০গ্রা/শতক; ৪কেজি/একর; ১০কেজি/হেক্টর |
| প্রথম ফুল | বীজ বপনের ৪৫-৫০ দিন পর |
| ফসল সংগ্রহ | ফুলের ২০-২৫ দিন পর |
| ফলন মৌসুম | ৪ মাসেরও বেশি |
শিমের আগাম চাষের জন্য জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় এবং শীতকালীন চাষের জন্য ভাদ্র থেকে আশ্বিন (আগস্ট–সেপ্টেম্বর) মাসে বীজ বপন করুন। বীজ বপনের ৫৫-৬০ দিনে ফুল আসে এবং ফুলের ২০-২৫ দিন পর ফসল সংগ্রহ শুরু হয়।
শিমের পুষ্টিগুণ
USDA FoodData Central অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা শিমে রয়েছে:[³]
| পুষ্টি উপাদান | পরিমাণ | দৈনিক চাহিদার % |
|---|---|---|
| ক্যালোরি | ৪৭ কিলোক্যালরি | — |
| প্রোটিন | ২.৮ গ্রাম | ৬% |
| ফাইবার | ৫.৪ গ্রাম | ১৯% |
| ভিটামিন C | ১৮.৮ মিগ্রা | ২১% |
| ভিটামিন K | ১৪.৯ মাইক্রোগ্রাম | ১২% |
| ফোলেট | ৬২ মাইক্রোগ্রাম | ১৬% |
| ম্যাঙ্গানিজ | ০.২৬ মিগ্রা | ১১% |
শিমে থাকা উচ্চমাত্রার ফাইবার ও ফোলেট হজমশক্তি উন্নয়ন ও রক্তশর্করা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর।
জাত নির্বাচন
গ্রীষ্মকালীন ও আগাম জাত:
| জাত | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| অটো শিম | বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে বপন; শ্রাবণ থেকে চৈত্র পর্যন্ত বিরামহীন ফলন |
| পুটি শিম | আগাম চাষে উপযুক্ত |
| BU শিম-৩ | সারা বছর চাষযোগ্য; শিমের রঙ বেগুনি |
| ইপসা শিম-১ | সারা বছর চাষযোগ্য; শিমের রঙ বেগুনি |
| ইপসা শিম-২ | সারা বছর চাষযোগ্য; শিমের রঙ সাদাটে সবুজ |
| BARI শিম-২ | আগাম জাত; আষাঢ়-ভাদ্রে বপন |
শীতকালীন জাত:
| জাত | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| BARI শিম-১ | শীতকালীন নম্বর ওয়ান জাত |
| BARI শিম-৬ | উচ্চফলনশীল |
| নলডগ, হাতিকান, গোলগাদ্দা | স্থানীয় জনপ্রিয় জাত |
BARI-এর গবেষণায় (২০২২-২৩) দেখা গেছে, BU শিম-৩ সারা বছর চাষযোগ্য এবং এটি ৫৬ দিনে প্রথম ফুল দেয় — যা আগাম ফলনের জন্য আদর্শ।[⁴]
ধাপে ধাপে শিম চাষ পদ্ধতি
ধাপ ১ — জমি নির্বাচন ও মাদা তৈরি
জমির বৈশিষ্ট্য:
- উঁচু জমি — শিম জলাবদ্ধতা সহ্য করে না
- পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকতে হবে
- সুনিষ্কাশযুক্ত দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি
মাদার আকার ও দূরত্ব:
- মাদার দৈর্ঘ্য × প্রস্থ × গভীরতা: ৪৫ × ৪৫ × ৪৫ সেমি
- এক মাদা থেকে অন্য মাদার দূরত্ব: ৩.০ মিটার
ধাপ ২ — সার প্রয়োগ পদ্ধতি
মাদা তৈরির সময় প্রতি মাদায় সার:
| সারের নাম | পরিমাণ |
|---|---|
| গোবর | ১০ কেজি |
| সরিষার খৈল | ২০০ গ্রাম |
| ছাই | ২ কেজি |
| টিএসপি | ১০০ গ্রাম |
| এমওপি | ৫০ গ্রাম |
উপরি সার (চারা গজানোর পর):
- ১৪-২১ দিন পর পর দুই কিস্তিতে প্রতি মাদায় ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০ গ্রাম এমওপি
- ফলন সংগ্রহের পর গাছের অবস্থা বুঝে ইউরিয়া, পটাশ, ডিএপি, জিংক, বোরন দিন
- হরমোন হিসেবে ফ্লোরা বা লিটোসেন ব্যবহার করা যায়
ধাপ ৩ — বীজ বপন ও মাচা
বীজ বপনের পদ্ধতি:
- বীজ বোনার আগে ১০-১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন
- প্রতি মাদায় ৪-৫টি বীজ বুনুন
- চারা গজানোর পর প্রতি মাদায় ২-৩টি সুস্থ চারা রেখে বাকি তুলুন
- বর্ষার সময় মাদার ভরাট মাটি ৫ সেমি উঁচু রাখুন
সারি পদ্ধতিতে: সারি থেকে সারি ৩০ সেমি দূরে, সারিতে ১৫ সেমি দূরে বীজ লাগান।
মাচার ব্যবস্থা:
- গাছ ১৫-২০ সেমি লম্বা হলে মাচা বা বাউনির ব্যবস্থা করুন
- শিম গাছ লতা নেওয়ার সুযোগ যত বেশি পাবে — ফলন তত বেশি হবে
ধাপ ৪ — পরিচর্যা ও সেচ
- গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেবেন না
- নিয়মিত নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করুন
- শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনমতো সেচ দিন
- গাছ বেশি বাড়লে শাখাপ্রশাখার আগা ভেঙে দিন
ধাপ ৫ — ছাদ বাগানে শিম চাষ
- একটি টবেই শিম চাষ সম্ভব — মাত্র ২ বর্গফুট জায়গা লাগে
- ১৫-২০ কেজি মাটিতেও ভালো ফলন পাওয়া যায়
- একটি টবে সর্বোচ্চ ২টি গাছ রাখুন
- চারা গজানোর পর ৪-৫ ফুট লম্বা খুঁটি পুঁতে ফ্রেম তৈরি করুন
- ফ্রেমে সুতা বা রশি মুড়িয়ে মাচা তৈরি করুন
- গাছ ৪-৫ ফুট লম্বা হলে ডগা কেটে দিন — বেশি ছড়াতে দেবেন না
ধাপ ৬ — ফসল সংগ্রহ
- বীজ বপনের ৫৫-৬০ দিনে ফুল আসে
- ফুলের ২০-২৫ দিন পর ফসল সংগ্রহ করুন
- কচি অবস্থায় শিম সংগ্রহ করুন
- ৪ মাসেরও বেশি সময় ধরে ফলন পাওয়া যায়
⚠️ সতর্কতা: রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগের অন্তত ৭ দিন পর ক্ষেতের শিম বিক্রি বা খাওয়া যাবে।
পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন
| রোগ/পোকা | ধরন | লক্ষণ | প্রতিকার |
|---|---|---|---|
| মোজাইক ভাইরাস | ভাইরাস | পাতায় হলুদ-সবুজ ছোপ | আক্রান্ত গাছ তুলুন; বাহক পোকা দমন করুন |
| অ্যানথ্রাকনোজ | ছত্রাক | পাতায় কালো দাগ; ফলে বাদামি দাগ | ম্যানকোজেব ২গ্রা/লি স্প্রে; আক্রান্ত পাতা পোড়ান |
| পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা | পোকা | পাতায় আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গ | ইমিডাক্লোপ্রিড স্প্রে; হলুদ ফাঁদ |
| জাব পোকা ও সাদা মাছি | পোকা | পাতার রস শোষণ; ভাইরাস ছড়ায় | ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক স্প্রে |
| ফল ছিদ্রকারী পোকা | পোকা | ফলে ছিদ্র করে নষ্ট করে | এমামেকটিন বেনজোয়েট বা সাইপারমেথ্রিন স্প্রে |
| লাল ক্ষুদ্র মাকড় | মাকড় | পাতা হলুদ ও কুঁকড়ানো | সালফার জাতীয় মাকড়নাশক স্প্রে |
| থ্রিপস | পোকা | ফুলে আক্রমণ; ফল ধরতে বাধা | ইমিডাক্লোপ্রিড স্প্রে; হলুদ ফাঁদ |
| গান্ধি পোকা | পোকা | পাকা ফলে আক্রমণ | কীটনাশক স্প্রে; পরিষ্কার চাষাবাদ |
গুরুত্বপূর্ণ: শীতকালীন শিমে বালাইনাশক কম লাগে — তাই শীতকালীন শিম চাষে খরচ তুলনামূলক কম।[²]
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
উত্তর: আগাম চাষের জন্য জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় এবং শীতকালীন চাষের জন্য শ্রাবণ-ভাদ্র মাস সর্বোত্তম।
উত্তর: বীজ বপনের ৫৫-৬০ দিনে ফুল আসে এবং ফুলের ২০-২৫ দিন পর ফসল সংগ্রহ করা যায়।
উত্তর: BARI শিম-১ শীতকালীন চাষে সর্বোত্তম। BARI-এর গবেষণায় এটি সর্বোচ্চ ফলন দিয়েছে।[⁴]
উত্তর: BU শিম-৩, ইপসা শিম-১, ইপসা শিম-২ এবং অটো শিম সারা বছর চাষযোগ্য। অটো শিম বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে বপন করলে শ্রাবণ থেকে চৈত্র পর্যন্ত বিরামহীন ফলন দেয়।
উত্তর: হ্যাঁ। মাত্র ২ বর্গফুট জায়গায় একটি টবে শিম চাষ সম্ভব। ১৫-২০ কেজি মাটিতেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।
উত্তর: রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগের অন্তত ৭ দিন পর ক্ষেতের শিম বিক্রি বা খাওয়া যাবে।
সংক্ষিপ্ত চাষ ক্যালেন্ডার
| সময় | কাজ |
|---|---|
| জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় | আগাম শিমের বীজ বপন |
| ভাদ্র থেকে আশ্বিন (আগস্ট–সেপ্টেম্বর) | শীতকালীন শিমের বীজ বপন |
| বীজ বপনের আগের রাতে | ১০-১২ ঘণ্টা পানিতে ভেজানো |
| চারা গজানোর পর | মাদায় ২-৩টি চারা রাখুন |
| গাছ ১৫-২০ সেমি হলে | মাচা বা বাউনির ব্যবস্থা |
| চারা গজানোর ১৪-২১ দিন পর | ১ম কিস্তি উপরি সার |
| আরো ১৪-২১ দিন পর | ২য় কিস্তি উপরি সার |
| বীজ বপনের ৫৫-৬০ দিন পর | ফুল আসে |
| ফুলের ২০-২৫ দিন পর | ফসল সংগ্রহ শুরু |
শিম বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক ও কম ঝামেলার ফসল — ভাইরাসের আক্রমণ নেই, সার কম লাগে, বিশেষত শীতকালীন চাষে বালাইনাশকও কম প্রয়োজন। সঠিক জাত নির্বাচন, মাচার সুব্যবস্থা ও নিয়মিত পরিচর্যায় ৪ মাসেরও বেশি সময় ধরে ফলন পাওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র ও সাইটেশন
[¹] BAMiS / DAE Bangladesh. Bean (Shim) — Crop Information. https://www.bamis.gov.bd/en/crops/ (বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সার্ভিস — শিমের আনুষ্ঠানিক চাষ নির্দেশিকা)
[²] Islam, M.S. et al. (2019). Nitrogen fixation and yield performance of hyacinth bean (Lablab purpureus L.) varieties in Bangladesh. ResearchGate / Bangladesh Agricultural University. https://www.researchgate.net/publication/334201847 (শিমের নাইট্রোজেন সংযোজন ক্ষমতা — শীতকালীন চাষে বালাইনাশক কম লাগার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ)
[³] USDA FoodData Central. Beans, snap, green, raw. FDC ID: 169967. https://fdc.nal.usda.gov/food-details/169967/nutrients (শিমের পুষ্টি উপাদান — USDA ডেটাবেজ)
[⁴] BARI Annual Report (2022-23). Variety evaluation of hyacinth bean — BARI Shim-1, BU Shim-3, IPSA Shim-1, IPSA Shim-2. Olericulture Division, BARI Gazipur. https://bari.gov.bd/site/page/annual-reports (BARI শিম-১ শীতকালীন সর্বোত্তম; BU শিম-৩ সারা বছর চাষযোগ্য ও ৫৬ দিনে প্রথম ফুল)
[⁵] Banglapedia — National Encyclopedia of Bangladesh. Bean (Shim). https://en.banglapedia.org/index.php/Bean (বাংলাদেশে শিমের ইতিহাস, বিস্তার ও পঞ্চাশটিরও বেশি স্থানীয় জাতের তথ্য)
এই তথ্য বীজঘর কৃষি কথা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত। কৃষি বিষয়ক আরও তথ্যের জন্য বীজঘর ব্লগ অনুসরণ করুন।
আরো পড়ুন …
- আধুনিক কলমি শাক চাষ পদ্ধতি
- সহজ পালং শাক চাষ পদ্ধতি
- সহজ লালশাক চাষ পদ্ধতি জেনে নিন
- যেভাবে সঠিক পদ্ধতিতে ধনিয়া চাষ করবেন
- আধুনিক বেগুন চাষ পদ্ধতি ও পরিচর্যা
- কোন মাসে কী ধরনের শাক-সবজি ও ফল চাষ করবেন
Discover more from BeejGhor.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

