কৃষি কাজ কেবল মাটি আর বীজের ওপর নির্ভরশীল নয়;এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ভৌগোলিক অবস্থান এবং আবহাওয়া। আমরা অনেকেই জানি,সবজি চাষের জন্য দোআঁশ মাটি ভালো বা রোদজ্বল জায়গা প্রয়োজন।
কিন্তু আমরা অনেকেই যে বিষয়টি উপেক্ষা করি,তা হলো—সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে জমির উচ্চতা (Elevation)।
ভৌগোলিক উচ্চতার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাপমাত্রা,আর্দ্রতা,বায়ুর চাপ এবং সূর্যালোকের তীব্রতার পরিবর্তন হয়। একারণেই সমতল ভূমিতে যে ফসলটি বাম্পার ফলন দেয়,পাহাড়ি এলাকায় সেই একই ফসল চাষ করলে আশানুরূপ ফল না–ও মিলতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণা ও চার্ট অনুযায়ী,ভূমির উচ্চতার ওপর ভিত্তি করে শাকসবজির অভিযোজন ক্ষমতা ভিন্ন ভিন্ন হয়।
আজকের ব্লগে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব—নিম্নভূমি,মধ্যম ভূমি এবং উচ্চ ভূমিতে কোন কোন সবজি চাষ করা সবচেয়ে লাভজনক এবং কেন জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রে উচ্চতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
১.উচ্চতাকেনসবজিচাষেগুরুত্বপূর্ণ?
আলোচনায় প্রবেশের আগে আমাদের বুঝতে হবে উচ্চতা কীভাবে ফসলের ওপর প্রভাব ফেলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আমরা যত ওপরে উঠব,বাতাসের তাপমাত্রা তত কমতে থাকে। সাধারণত প্রতি ১০০০ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে তাপমাত্রা প্রায় ৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়।
- তাপমাত্রা:নিম্নভূমিতে তাপমাত্রা বেশি থাকে,যা গ্রীষ্মকালীন সবজির জন্য ভালো। অন্যদিকে উচ্চভূমিতে তাপমাত্রা কম থাকে,যা শীতকালীন বা বিদেশি সবজির জন্য আদর্শ।
- অক্সিজেনওকার্বনডাই–অক্সাইড:উচ্চতা বাড়লে বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব কমে,যা উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে।
- কুয়াশাওআর্দ্রতা:পাহাড়ি বা উঁচু এলাকায় কুয়াশা বেশি থাকে,যা কিছু ফসলের জন্য ক্ষতিকর হলেও কপি গোত্রীয় সবজির জন্য আশীর্বাদ হতে পারে।
২.নিম্নভূমিরশাকসবজি (Lowland Vegetables)
উচ্চতা:সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০ মিটারের কম (<৩০০ মিটার)।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ কৃষি জমিই এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশের সমতল ভূমি,হাওর অঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকাগুলো মূলত নিম্নভূমি। এখানকার আবহাওয়া সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র থাকে।
ক.এইঅঞ্চলেরউপযোগীপ্রধানফসলসমূহ:
নিম্নভূমির আবহাওয়া গ্রীষ্মকালীন এবং তাপ–সহনশীল সবজির জন্য স্বর্গরাজ্য। চার্ট অনুযায়ী যে ফসলগুলো এখানে সবচেয়ে ভালো হয়:
- সলানাসিয়াসফসল:বেগুন,মরিচ এবং টমেটো (নির্দিষ্ট জাত)। এই ফসলগুলো প্রচুর রোদ এবং উষ্ণ আবহাওয়া পছন্দ করে।
- লতানোসবজি:লাউ,মিষ্টি কুমড়া,চালকুমড়া (পেচী),ঝিঙা,করলা এবং শসা। এই সবজিগুলো দ্রুত বর্ধনশীল এবং সমতলের আবহাওয়ায় পরাগায়ন ভালো হয়।
- অন্যান্য:ঢেরশ,কেংকং (কলমি শাক জাতীয়),তরমুজ এবং বাঙ্গি। বিশেষ করে তরমুজ ও বাঙ্গির মিষ্টতা আসার জন্য যে উষ্ণতার প্রয়োজন,তা নিম্নভূমিতেই পাওয়া যায়।
খ.চাষাবাদেরকৌশলওসতর্কতা:
যেহেতু এই অঞ্চলটি সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি,তাই এখানে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থাকে।
- জাতনির্বাচন:এমন জাত নির্বাচন করতে হবে যা উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে।
- রোগবালাই:উষ্ণ আবহাওয়ায় পোকামাকড় ও ছত্রাকের আক্রমণ বেশি হয়। তাই আগাম বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে।
- বিশেষনোট:চার্টে মিষ্টি মরিচ (ক্যাপসিকাম),টমেটো এবং শসার পাশে তারা চিহ্ন (*)দেওয়া আছে। এর অর্থ হলো,সাধারণ জাতগুলো এখানে ভালো হবে না;নিম্নভূমির জন্য বিশেষভাবে উদ্ভাবিত ‘হিট টলারেন্ট’বা তাপ সহনশীল হাইব্রিড জাত চাষ করতে হবে।
৩.মধ্যমভূমিরশাকসবজি (Mid-land Vegetables)
উচ্চতা:সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০ মিটার হতে ১০০০ মিটার পর্যন্ত।
এই উচ্চতাটি মূলত একটি ‘ট্রানজিশন জোন’বা ক্রান্তিকালীন এলাকা। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকা,সিলেটের টিলা অঞ্চল এবং ভারতের কিছু পাহাড়ি এলাকা এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। এখানকার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ—অর্থাৎ খুব গরমও নয়,আবার খুব ঠান্ডাও নয়।
ক.এইঅঞ্চলেরউপযোগীপ্রধানফসলসমূহ:
মধ্যম উচ্চতার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ফসলের বৈচিত্র্য। এখানে নিম্নভূমির ফসলের পাশাপাশি কিছু উচ্চভূমির ফসলও ফলানো সম্ভব।
- সবজি:শিম,বেগুন,মরিচ,ঢেরশ এবং করলা। শিম চাষের জন্য এই উচ্চতা খুবই উপযোগী কারণ এখানে রাতের তাপমাত্রা শিম এর ফুল ধরার জন্য সহায়ক।
- শীতকালীনসবজি (সারাবছর):সমতলে যা কেবল শীতে হয়,মধ্যম উচ্চতায় তা বছরের দীর্ঘ সময় চাষ করা যায়। যেমন—বাঁধাকপি,ফুলকপি এবং লেটুস।
- ফলজাতীয়সবজি:তরমুজ,বাঙ্গি এবং মিষ্টি কুমড়া এখানেও ভালো জন্মে।
- লতানোসবজি:লাউ,ঝিঙা,পেচী এবং কেংকং।
খ.চাষাবাদেরকৌশল:
মধ্যম উচ্চতার ভূমি সাধারণত ঢালু হয়। তাই এখানে চাষাবাদের ক্ষেত্রে ভূমি ক্ষয় রোধ করা প্রধান চ্যালেঞ্জ।
- মালচিং:মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত।
- অফ–সিজনচাষাবাদ:এই অঞ্চলের কৃষকরা সমতলের কৃষকদের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন। সমতলে যখন খুব গরম,তখনো মধ্যম উচ্চতায় তাপমাত্রা সহনীয় থাকে। ফলে এখানে অসময়ে (Off-season)বাঁধাকপি বা ফুলকপি চাষ করে বাজারে ভালো দাম পাওয়া সম্ভব।
৪.উঁচুভূমিরশাকসবজি (Highland Vegetables)
উচ্চতা:সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০০০ মিটারের বেশি কিন্তু ২৫০০ মিটারের কম।
এটি পুরোপুরি পাহাড়ি এবং ঠান্ডা আবহাওয়ার অঞ্চল। যদিও বাংলাদেশে এই উচ্চতার জমি খুব কম (বান্দরবানের কিছু চূড়া ছাড়া),তবে বৈশ্বিক কৃষি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর পার্বত্য কৃষির জন্য এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার আবহাওয়া অনেকটা শীতপ্রধান দেশের মতো।
ক.এইঅঞ্চলেরউপযোগীপ্রধানফসলসমূহ:
উচ্চ মূল্যের সবজি (High Value Crops)এবং এক্সোটিক ভেজিটেবল চাষের জন্য এই অঞ্চল সেরা।
- মূলজাতীয়সবজি:গাজর ও আলু। আলুর টিউবার বা কন্দ গঠনের জন্য ঠান্ডা আবহাওয়া অপরিহার্য,যা এখানে প্রাকৃতিকভাবেই পাওয়া যায়।
- শীতলআবহাওয়ারসবজি:মটরশুঁটি (Peas),ফুলকপি এবং ব্রোকলি। ব্রোকলি ও ফুলকপির আঁটসাঁট বা ভরাট কার্ড (Curd)পেতে হলে এই উচ্চতার আবহাওয়া সবচেয়ে উপযোগী।
- সালাদআইটেম:লেটুস,শসা এবং সালাদ টমেটো (Salad Tomato)। লেটুস পাতার মুচমুচে ভাব এবং সঠিক রং আসার জন্য ঠান্ডা আবহাওয়া প্রয়োজন।
- মিষ্টিমরিচবাক্যাপসিকাম:ক্যাপসিকামের উজ্জ্বল রং এবং পুরু ত্বক গঠনের জন্য উচ্চভূমির আবহাওয়া আদর্শ।
খ.চাষাবাদেরসুবিধাওচ্যালেঞ্জ:
- সুবিধা:এখানে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রকোপ সমতলের চেয়ে কম থাকে। বিশেষ করে বীজ আলু উৎপাদনের জন্য উচ্চভূমিকে ‘ভাইরাস মুক্ত জোন’হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
- চ্যালেঞ্জ:অতি বৃষ্টি এবং ভূমিধস এখানকার প্রধান সমস্যা। এ ছাড়া রাতে তাপমাত্রা খুব বেশি কমে গেলে ‘ফ্রস্ট’বা তুষারপাতে ফসল পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৫.জাতনির্বাচনেরসতর্কতা (তারাচিহ্নিত *ফসলেরগুরুত্ব)
আপনার চার্টে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নোট দেওয়া হয়েছে: “যুক্তশাকসবজিজাতএরউপরনির্ভরশীল,আপনারস্থানীয়বীজসরবরাহকারীরসাথেপরামর্শকরুন!”
বিশেষ করে টমেটো,মিষ্টি মরিচ (ক্যাপসিকাম),শসা,ফুলকপি এবং ব্রোকলির পাশে (*)চিহ্ন দেওয়া আছে। এর কারণ হলো—
১.টমেটো:উচ্চভূমির টমেটো আর নিম্নভূমির টমেটোর জাত সম্পূর্ণ আলাদা। নিম্নভূমির জাতগুলো ‘উইন্টার’বা ‘সামার’ভ্যারাইটি হতে পারে যা উচ্চ তাপ সইতে পারে। কিন্তু উচ্চভূমির জাতগুলো মূলত ঠান্ডা পছন্দ করে। ভুল জাত নির্বাচন করলে গাছে ফুল আসবে কিন্তু ফল ধরবে না (Fruit setহবে না)।
২.ফুলকপিওবাঁধাকপি:কিছু জাত আছে যা কেবল নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় (যেমন ১৫–২০ ডিগ্রি সে.)কার্ভ গঠন করে। আবার কিছু ‘ট্রপিক্যাল’জাত আছে যা ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রাতেও ভালো হয়। উচ্চতার ভিত্তিতে সঠিক জাতটি বেছে নেওয়া তাই অপরিহার্য।
৬.কৃষকদেরজন্যকিছুসাধারণপরামর্শ
ভূমির উচ্চতা যা–ই হোক না কেন,সফল চাষাবাদের জন্য নিচের টিপসগুলো মনে রাখা জরুরি:
- মাটিপরীক্ষা:উচ্চতা অনুযায়ী মাটির অম্লতা বা ক্ষারত্ব (pH)পরিবর্তিত হতে পারে। পাহাড়ি মাটি সাধারণত অম্লীয় হয়। তাই চাষের আগে মাটি পরীক্ষা করে চুন বা জিপসাম প্রয়োগ করুন।
- সেচব্যবস্থা:উঁচু জমিতে পানি ধরে রাখা কঠিন। তাই ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দু সেচ পদ্ধতি ব্যবহার করলে পানির অপচয় রোধ হবে এবং গাছ সঠিক পরিমাণে পানি পাবে।
- স্থানীয়অভিজ্ঞতা:আপনি যে উচ্চতায় চাষ করছেন,সেখানে স্থানীয়ভাবে কোন জাতগুলো ভালো ফলন দিচ্ছে,তা পর্যবেক্ষণ করুন এবং স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিন।
উপসংহার
কৃষি এখন আর সনাতন পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ নেই;এটি এখন পুরোপুরি বিজ্ঞান। ভূমির উচ্চতার সাথে ফসলের অভিযোজন ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝা আধুনিক কৃষির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আপনি যদি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০ মিটারের নিচের সমতলে থাকেন,তবে লাউ–কুমড়া আর বেগুন–মরিচই আপনার প্রধান শক্তি। আর যদি আপনি পাহাড়ি বা মধ্যম উচ্চতার বাসিন্দা হন,তবে অফ–সিজন সবজি এবং উচ্চমূল্যের ব্রোকলি বা ক্যাপসিকাম চাষ করে আপনি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
মনে রাখবেন,সঠিকজমি +সঠিকউচ্চতা +সঠিকজাত =বাম্পারফলন।
আপনার অঞ্চলের উচ্চতা এবং আবহাওয়া বুঝে আজই পরিকল্পনা করুন আপনার পরবর্তী ফসলের। কৃষির অগ্রযাত্রায় আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ হোক সুপরিকল্পিত।
(তথ্যসূত্র:ইস্ট–ওয়েস্টসিডএরগবেষণালব্ধচার্টএবংআধুনিককৃষিবিজ্ঞান)
আরও পড়ুন-
Discover more from বীজ ঘর ডটকম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
